লিউকেমিয়া/ব্লাড ক্যান্সার (Leukemia)

শেয়ার করুন

বর্ণনা

লিউকেমিয়া হলো রক্ত উৎপাদনকারী টিস্যুর একটি ব্যাধি। এর মধ্যে অস্থি মজ্জার লসিকা নালী বা Bone marrow lymphatic system অন্তর্ভুক্ত। শ্বেত রক্ত কণিকার মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদন এই রোগের বৈশিষ্ট্য। লিউকেমিয়ার অনেক ধরনের প্রকারভেদ রয়েছে, যেমন- অ্যাকিউট লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া [Acute lymphocytic leukemia (ALL)] অ্যাকিউট মাইলোয়েড লিউকেমিয়া [Acute myeloid leukemia (AML)], ক্রনিক লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া (Chronic lymphocytic leukemia), ক্রনিক মাইলোয়েড লিউকেমিয়া [Chronic myeloid leukemia (CML)] এবং হেয়ারি সেল লিউকেমিয়া (Hairy cell leukemia)। এই রোগের তীব্রতা কোষের ধরন এবং রোগটি কোন পর্যায়ে (অ্যাকিউট না ক্রনিক) আছে তার উপর নির্ভর করে।

লিউকেমিয়ার প্রকারভেদ:

ডাক্তাররা লিউকেমিয়া কত দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং কোন ধরনের কোষ এর অন্তর্ভুক্ত তার উপর ভিত্তি করে একে বিভিন্ন প্রকারে বিভক্ত করেন।

লিউকেমিয়া কত দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এর উপর ভিত্তি করে একে দুই ভাগে ভাগ করা যায়ঃ

  • অ্যাকিউট লিউকেমিয়া (Acute leukemia): এক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্লাড সেল বা রক্ত কোষগুলো অপরিণত অবস্থায় থাকে। এগুলি স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড করতে পারে না এবং দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে। এর ফলে এই রোগ খুব তাড়াতাড়ি খারাপ পর্যায়ে চলে যায়। এই রোগের চিকিৎসা সময়মত এবং দ্রুত করা প্রয়োজন।
  • ক্রনিক লিউকেমিয়া (Chronic leukemia): পরিণত ব্লাড সেল বা রক্ত কোষের কারণে এই লিউকেমিয়া হয়। এক্ষেত্রে কোষের সংখ্যাবৃদ্ধি খুব ধীরে ধীরে হয় এবং এগুলো স্বাভাবিকভাবে সকল কর্মকাণ্ড করে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই লিউকেমিয়া প্রাথমিকভাবে কোনো লক্ষণ দেখায় না।

কোন ধরনের শ্বেতকণিকা আক্রান্ত হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে লিউকেমিয়াকে দুইভাগে ভাগ করা যায়ঃ

  • লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া (Lymphocytic leukemia): এই ধরনের লিউকেমিয়াতে লিম্ফোয়েড সেল বা কোষ (লিম্ফোসাইট) আক্রান্ত হয়। লিম্ফেটিক টিস্যু দ্বারা ইমিউন সিস্টেম গঠিত।
  • মাইলোয়েড লিউকেমিয়া (Myeloid leukemia): এই ধরনের লিউকেমিয়াতে মাইলোয়েড কোষ আক্রান্ত হয়। মাইলোয়েড কোষ থেকেই রক্তের বিভিন্ন কণিকা যেমন লোহিত রক্ত কণিকা, শ্বেত রক্ত কণিকা এবং অণুচক্রিকা সৃষ্টি হয়।
এছাড়াও আরও কয়েক ধরনের লিউকেমিয়া আছে যেগুলি কিছুটা বিরল, যেমন- হেয়ারি সেল লিউকেমিয়া (Hairy cell Leukemia), মাইলোডিস্প্লাস্টিক সিন্ড্রোম (Myelodysplastic syndromes) ও মাইলোপ্রোলিফারেটিভ ডিজঅর্ডার (Myeloproliferative disorders) ইত্যাদি।

কারণ

বিজ্ঞানীরা এই রোগের সঠিক কারণ সম্বন্ধে এখনো নিশ্চিত নন। এটি জীনগত এবং পরিবেশগত কারণে হয়ে থাকে বলে ধারণা করা হয়।

লিউকেমিয়া যেভাবে হয়:

ধারণা করা হয় যে, ব্লাড সেলের ডি-এন-এর(DNA) পরিবর্তনের কারণে কোষের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপের পরিবর্তন (মিউটেশন) হলে লিউকেমিয়া হয়। এছাড়াও কোষের অন্য কোনো পরিবর্তনের জন্যও লিউকেমিয়া হতে পারে যা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।

কিছু অস্বাভাবিকতার কারণে কোষ খুব দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে এবং নির্দিষ্ট সময়ের পরও তা নষ্ট হয় না। সময়ের সাথে সাথে Bone marrow বা অস্থি মজ্জায় এই অস্বাভাবিক কোষগুলোর পরিমাণ বেড়ে যায় এবং সুস্থ ও সজীব কোষের পরিমাণ কমে যায়। এর ফলে লিউকেমিয়ার লক্ষণ দেখা যায়।

লক্ষণ

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসকেরা নিম্নলিখিতলক্ষণগুলি চিহ্নিত করে থাকেন:  

চিকিৎসা

চিকিৎসকেরা এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিম্নলিখিত ঔষধগুলি গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন:

cytarabine vincristine
methotrexate

চিকিৎসকেরা এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিম্নলিখিত টেস্টগুলি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন:

সি-বি-সি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) (CBC, Complete Blood Count)
বোন মেরো স্টাডি (Bone marrow study)
বোন মেরো ট্রান্সপ্ল্যান্ট (Bone marrow transplant)

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়

নিম্ললিখিত বিষয়ের কারণে লিউকেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়ঃ

  • যদি কোনো ব্যক্তি পূর্বে কোনো ক্যান্সারে আক্রান্ত থাকে এবং এর চিকিৎসার জন্য কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন থেরাপি নিয়ে থাকেন তবে তার লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • জিনগত অস্বাভাবিকতার কারণে লিউকেমিয়া হতে পারে। কিছু জেনেটিক ডিজঅর্ডার যেমন ডাউন সিন্ড্রোমের (Down syndrome) কারণে লিউকেমিয়া হতে পারে।
  • যাদের কোনো ব্লাড ডিজঅর্ডার (যেমন মাইলোডিস্প্লাস্টিক সিন্ড্রোম) (Myelodysplastic syndromes) আছে তাদের লিউকেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • যারা রেডিয়েশনের সংস্পর্শে বেশি থাকে তাদের লিউকেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের (যেমন- বেনজিন যা গ্যাসোলিনে পাওয়া যায় এবং ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহার করা হয়) সংস্পর্শে যারা বেশি থাকে তাদের লিউকেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • ধূমপানের কারণেও লিউকেমিয়া হতে পারে।
  • কোনো ব্যক্তির পরিবারের কারো যদি লিউকেমিয়া থাকে তবে তারও রোগটি হতে পারে।

যারা ঝুঁকির মধ্যে আছে

লিঙ্গঃ পুরুষদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের গড়পড়তা সম্ভাবনা রয়েছে। মহিলাদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের সম্ভাবনা ১ গুণ কম।

জাতিঃ কৃষ্ণাঙ্গ এবং হিস্প্যানিকদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের সম্ভাবনা ১ গুণ কম। শ্বেতাঙ্গ এবং অন্যান্য জাতির মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের গড়পড়তা সম্ভাবনা রয়েছে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

উত্তরঃ এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হেমাটোলোজিস্টের (Hematologist) কাছে যেতে হবে।

উত্তরঃ কেমোথেরাপির প্বার্শপ্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, কারণ এই থেরাপি শুধুমাত্র লিউকেমিয়া আক্রান্ত কোষকে নষ্ট করে না, সুস্থ কোষ এবং টিস্যুকেও ধ্বংস করে এবং প্বার্শপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ক্যান্সার চিকিৎসার প্বার্শপ্রতিক্রিয়া বিভিন্ন রকমের হয়। এই প্বার্শপ্রতিক্রিয়া চিকিৎসার ধরন এবং এর ব্যাপ্তির উপর নির্ভর করে। এছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির মাঝে ভিন্ন ভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এই রোগের একেকটি চিকিৎসার প্বার্শপ্রতিক্রিয়া একেক রকম হয়।

উত্তরঃ চিকিৎসার মাধ্যমে প্রায় ৬ বছর রোগী বেঁচে থাকতে পারে। ইনফেকশনের কারণে প্রায় ৫০% রোগী মারা যায়।

হেলথ টিপস্‌

লিউকেমিয়াকে প্রতিরোধ করার কার্যকর কোনো উপায় নেই। রেডিয়েশন, রাসায়নিক পদার্থ (যেমন বেনজিনের সংস্পর্শ), ধূমপান তামাক ব্যবহার এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কেমোথেরাপি এড়িয়ে চলার মাধ্যমে কিছু ধরনের লিউকেমিয়া প্রতিরোধ করা যায়।