হাইপোগ্লাইসেমিয়া (Hypoglycemia)

শেয়ার করুন

বর্ণনা

রক্তে সুগার/গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে কমে গেলে তাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়। তবে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার সমস্যা কিভাবে হয় তা বুঝতে হলে প্রথমত জানতে হবে মানবদেহে কোন প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ উৎপাদিত হয় ও তা কি কাজ করে।

রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রনঃ

শক্তি উৎপাদন ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্লুকোজ বা সুগারের প্রয়োজন। খাদ্যগ্রহণের পর তা হজম হয়ে খাদ্যে উপস্থিত শর্করা ভেঙ্গে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়ে রক্তে শোষিত হয়। রক্ত থেকে গ্লুকোজ ইনসুলিনের (এক ধরনের হরমোন যা পেনক্রিয়াস হতে নিঃসৃত হয়) সাহায্যে কোষে প্রবেশ করে এবং কোষের কার্যকারিতা সঠিক রাখতে শক্তি যোগায়। দেহের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত গ্লুকোজ গ্রহণ করা হলে তা গ্লাইকোজেন রূপে আমাদের লিভার ও মাংসপেশীতে জমা হয়। এই প্রক্রিয়ায় রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ ও ইনসুলিনের নিঃসরণের মাত্রা স্বাভাবিক থাকে। অপরদিকে, টানা কয়েক ঘন্টা না খেয়ে থাকলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হ্রাস পায়। এ অবস্থায় প্যানক্রিয়াসে উপস্থিত গ্লুকাগন নামক হরমোনের প্রভাবে লিভার জমাকৃত অতিরিক্ত গ্লাইকোজেন নিঃসরণ করে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো কিছু খাওয়ার আগ পর্যান্ত আমাদের দেহে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক থাকে।

হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দিলে এ অবস্থায় দেহে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যায়। ডায়েবেটিস আক্রান্ত রোগীর হাইপোগ্লাইসেমিয়া বেশি হয়ে থাকে। অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার কারণেও রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে, তবে এটি খুব বিরল। অনেকেই ভেবে থাকেন হাইপোগ্লাইসেমিয়া একটি রোগ। তবে জ্বরের মতো, হাইপোগ্লাইসেমিয়া কোনো রোগ নয়। এটি অন্য কোনো রোগ বা শারীরিক সমস্যার একটি লক্ষণ। হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দেওয়ার সাথে সাথে রোগীকে উচ্চমাত্রায় চিনিযুক্ত খাবার দিতে হবে। এই ধরনের রোগীর দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার প্রয়োজন।

কারণ

হাইপোগ্লাইসেমিয়ার কারণগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ

ডায়াবেটিক রোগীর যে কারণে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে থাকেঃ

ডায়াবেটিস হলে দেহে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন তৈরী হতে পারে না (টাইপ 1 ডায়াবেটিস), অথবা এর কার্যকারিতা হ্রাস পায় (টাইপ 2 ডায়াবেটিস)। এর ফলে, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এই অবস্থায় গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে ডায়াবেটিক রোগীর ঔষধ বা আলাদাভাবে ইনসুলিন নেওয়ার প্রয়োজন হয়।

বেশি মাত্রায় ইনসুলিন নেওয়া হলে, রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যায় এবং হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দেয়। আবার ডায়াবেটিক ঔষধ খাওয়ার পর, পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার গ্রহণ করা না হলে (শর্করার অভাব দেখা দেওয়া) বা অতিরিক্ত ব্যায়াম বা অনুশীলন করলে (অত্যাধিক গ্লুকোজ ব্যবহার করা) হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে।

ডায়াবেটিস নেই এমন ব্যক্তির যে কারণে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে থাকেঃ

  • দেখা গেছে, অন্যের ডায়াবেটিক ঔষধ ভুলক্রমে খেয়ে ফেলার কারণে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যায়। এছাড়াও অন্যান্য ঔষধ ব্যবহারের কারণেও হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির এমন এই সমস্যার ঝুঁকি বেশি থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার জন্য কুনাইন ব্যবহার করা হলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • অনিয়মিত খাদ্যাভাসের সাথে অতিরিক্ত মদ্যপান হাইপোগ্লাইসেমিয়া অন্যতম কারণ। কেননা এ অবস্থায় আমাদের লিভারে জমাকৃত অতিরিক্ত গ্লুকোজ রক্তে নিঃসরণ করতে পারে না। ফলে গ্লুকোজের ঘাটতি দেখা দেয়।
  • লিভারের যেকোনো গুরুতর সমস্যা, যেমন গুরুতর হেপাটাইটিস এবং কিডনির সমস্যা থাকলে ব্যক্তি হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার কারণে ক্ষুধামন্দাসহ খাদ্যাভাসের অন্যান্য অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। যার ফলে, দেহে পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্লুকোজ উৎপাদিত হতে পারে না এবং গ্লুকোজের অভাব দেখা দেয়।
  • প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়ে ইনসুলিনোমা (insulinoma) নামক টিউমার হলে ইনসুলিন উৎপাদনের মাত্রা বেড়ে যায়। যার ফলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ হ্রাস পেতে শুরু করে। তবে এই টিউমার খুব বেশি দেখা যায় না। আবার, প্যানক্রিয়াস ইনসুলিন উৎপাদনকারী বিটা সেল বড় হয়ে গেলে ইনসুলিন তৈরীর মাত্রা বেড়ে যায় ও পরবর্তীতে হাইপোগ্লাইসেমিয়া দেখা দেয়।
  • অ্যাড্রেনালিন গ্রন্থি এবং পিটুইটারি গ্রন্থির ত্রুটি দেখা দিলে দেহে গ্লুকোজ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণকারী কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের ঘাটতি দেখা দেয়। এই সমস্যায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

অন্যান্যঃ

সাধারণত দেখা গেছে, দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার কারণে (রোজা অবস্থায়) হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে থাকে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় দেহে ইনসুলিন উৎপাদনের মাত্রা বেড়ে গেলে সঠিক সময় অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণের পরও হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে। এই ধরনের হাইপোগ্লাইসেমিয়াকে বলা হয় রিএ্যাক্টিভ (reactive) বা পোস্টপ্র্যান্ডায়াল হাইপোগ্লাইসেমিয়া (postprandial hypoglycemia)। পাকস্থলিতে অপারেশন করা হয়েছে এমন ব্যক্তির পোস্টপ্র্যান্ডায়াল হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে থাকে। তবে সম্পূর্ণ সুস্থ ব্যক্তিরও এই ধরনের সমস্যা হতে পারে।

লক্ষণ

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসকেরা নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি চিহ্নিত করে থাকেন

চিকিৎসা

dextrose octreotide acetate
glucagon diazoxide

 চিকিৎসকেরা এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিম্নলিখিত ঔষধগুলি গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন: 

ব্লাড গ্লুকোজ, র‍্যান্ডম (Blood Glucose, Random)
ইলেক্ট্রোলাইটস, সেরাম (Electrolytes, serum)
ও-জি-টি-টি (OGTT)
সি-বি-সি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) (CBC, Complete Blood Count)
টি-এস-এইচ (TSH)
ব্লাড কালচার (Blood culture)
ইউরিন এনালাইসিস (Urinalysis)

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়

যে যে বিষয়ের কারনে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় তা হলোঃ

  • ইনসুলিনোমা (Insulinoma)
  • ওজন কমানোর জন্য অপারেশন করা হলে।
  • অপুষ্টি
  • কিডনি ফেইলিয়র
  • ফাইব্রোমা (এক ধরনের টিউমার)
  • সারকোমা (Sarcoma)
  • ফাইব্রোসারকোমা (Fibrosarcoma)
  • অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির ত্রুটি
  • দেহে গ্রোথ হরমোনের অভাব
  • হাইপোপিটুইটারিজম (Hypopituitarism)
  • সেপসিস (Sepsis)
  • অ্যানারোক্সিয়া নার্ভোসা (Anorexia nervosa) 

যারা ঝুঁকির মধ্যে আছে

লিঙ্গঃ পুরুষদের এবং মহিলাদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের গড়পড়তা সম্ভাবনা রয়েছে।

জাতিঃ কৃষ্ণাঙ্গ এবং শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের গড়পড়তা সম্ভাবনা রয়েছে। হিস্পানিক এবং অন্যান্য জাতিদের মধ্যে এই রোগ নির্ণয়ের সম্ভাবনা ১ গুণ কম।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

উত্তরঃ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নয় এমন ব্যক্তির হাইপোগ্লাইসেমিয়া হওয়ার একটি কারণ হলো অতিরিক্ত গ্লুকোজ সমৃদ্ধ খাদ্যগ্রহণ। যেসব খাবারে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি সেসব খাবার খেলে দেহে অধিক পরিমাণে ইনসুলিন উৎপন্ন হয় যার ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যায়। নিয়মিত ব্যায়াম বা অনুশীলন করা হলে ইনসুলিনের সাহায্য ছাড়াই রক্তে উপস্থিত গ্লুকোজ কোষ প্রবেশ করতে পারে। ফলে ব্যায়াম ও অনুশীলনের মাধ্যমে এই সমস্যা খুব সহজে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

উত্তরঃ হাইপোগ্লাইসেমিয়া ইনসুলিন রিঅ্যাকশন (Insulin reaction) বা ইনসুলিন শক (Insulin shock) নামেও পরিচিত। কারন দেহে ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে গেলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে। এছাড়াও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত ঔষধের প্বার্শপ্রতিক্রিয়ার ফলেও হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে।

হেলথ টিপস্‌

হাইপোগ্লাইসেমিয়া নিয়ন্ত্রণে নিম্নলিখিত নির্দেশনা মেনে চলতে হবেঃ

  • ডায়াবেটিক রোগীর জন্যঃ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের বিভিন্ন উপায়গুলো ভালোভাবে জেনে নিন। প্রয়োজনে একটি তালিকা তৈরী করুন। যদি ঔষধ ও খাওয়ার সময় পরিবর্তন করতে চান বা নতুন কোনো অনুশীলন করতে চান, তবে যে কোনো পরিবর্তনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং এসব পরিবর্তনের ফলে কি কি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে তা জেনে নিন।
  • ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নয় এমন রোগীর জন্যঃ ডায়াবেটিস নেই কিন্তু হাইপোগ্লাইসেমিয়া দ্বারা একাধিক বার আক্রান্ত হয়েছে এমন ব্যক্তির দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে না থেকে কিছুক্ষণ পর পর অল্প অল্প করে কিছু খাওয়া উচিত। এভাবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব। কিন্তু এভাবে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বেশিদিন নিয়ন্ত্রনে রাখা যায় না। চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে হাইপোগ্লাইসেমিয়া অন্তর্নিহিত কারণ জানতে হবে এবং চিকিৎসা করাতে হবে।

বিশেষজ্ঞ ডাক্তার

ডাঃএস জি মোগনী মওলা

মেডিসিন ( Medicine)

MBBS, FCPS(Medicine), FACP(America)

ডা: এম.এ হাছানাত

এন্ডোক্রাইনোলজি এন্ড মেটাবলিজম ( হরমোন) ( Endocrinology & Metabolism)

ডা: ইন্দ্রজিত প্রসাদ

এন্ডোক্রাইনোলজি এন্ড মেটাবলিজম ( হরমোন) ( Endocrinology & Metabolism)

ডাঃ শাহাজাদা সেলিম

এন্ডোক্রাইনোলজি এন্ড মেটাবলিজম ( হরমোন) ( Endocrinology & Metabolism)

প্রফেসর ডাঃ মোঃ আলি হোসেন

মেডিসিন ( Medicine)

MBBS,FCPS,MD

প্রফেসর ডা: খাজা নাজিম উদ্দীন

মেডিসিন ( Medicine)

MBBS(Dhaka),FCPS(Med), FRCP(Glasgo), FCPS(USA)